জীবনের প্রতি ক্রমবর্ধমান বিতৃষ্ণা, হতাশা আর অনিশ্চয়তা বোধ মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে চরম সিদ্ধান্তের দিকে। সামাজিক বন্ধন দুর্বল হওয়া, পারিবারিক উষ্ণতার অভাব, অর্থনৈতিক চাপ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবহেলা মিলিয়ে আত্মহত্যা যেন অনেকের কাছে ‘শেষ মুক্তির পথ’ হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় বগুড়ায় গত কয়েক বছরে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে আত্মহত্যার ঘটনা, যা সমাজের গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত এক বছরেই জেলার ১২ টি উপজেলায় চার শতাধিক মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং সমাজের গভীর সংকট ও নীরব ব্যথার প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক কারণ জড়িত। পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য সংকট, প্রেমঘটিত হতাশা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, ঋণের চাপ এবং মাদকাসক্তি আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব ও সামাজিক সচেতনতার ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু সায়েম বলেন, পারিবারিক, সামাজিক ও পরিবেশগত নানা কারণে আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে। মূলত হতাশা থেকেই মানুষ এই চরম সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সিজোফ্রেনিয়া, উদ্বেগ ও অন্যান্য মানসিক গোলযোগ আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায়। কারও মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা গেলে বিষয়টি হালকাভাবে না নিয়ে দ্রুত মানসিক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। নিয়মিত কাউন্সেলিং এবং পরিবার ও সমাজের সমর্থন আত্মহত্যা প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি গণসচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলেও মত দেন তিনি।
জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে,
উদ্বেগজনক পরিস্থিতি থেকে বের হতে ধর্মীয় দিক নির্দেশনা মেনে চলা জরুরী।এজন্য আগামী বৃহস্পতিবার ইমাম সম্মেলনে আত্মহত্যার প্রবনতার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে।পাশাপাশি জেলার প্রতিটি মসজিদে সপ্তাহের শুক্রবারে খুতবাতে আলোচনা করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার শাহাদাত হোসেন।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে বগুড়া জেলায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন ৪১১ জন। এরমধ্যে সদর উপজেলায় আত্মহত্যা করেছেন ১০০ জন, শিবগঞ্জ ও দুপচাঁচিয়ায় ৩৭ জন করে, আদমদিঘীতে ৩৫ জন, শাজাহানপুর ও শেরপুরে ৩২ জন করে, ধুনটে ২৮ জন, সারিয়াকান্দিতে ২৭ জন, গাবতলীতে ২৬ জন, কাহালুতে ২১ জন, সোনাতলায় ২০ জন এবং নন্দীগ্রামে ১৬ জন আত্মহত্যা করেছেন।
গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালে জেলায় আত্মহত্যা করেন ৩৩৫ জন, ২০২৩ সালে ৩৮৭ জন এবং ২০২২ সালে ৩৮৫ জন। অর্থাৎ ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চার বছরে বগুড়া জেলায় মোট ১ হাজার ৫১৮ জন আত্মহত্যা করেছেন।
বগুড়ার বিভিন্ন থানা এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আত্মহত্যার শিকারদের একটি বড় অংশ তরুণ ও কর্মক্ষম বয়সী। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষায় ব্যর্থতা, চাকরি না পাওয়া, পারিবারিক প্রত্যাশার চাপ কিংবা সামাজিক অপমান আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নারীদের মধ্যে পারিবারিক নির্যাতন ও দাম্পত্য কলহ এবং পুরুষদের মধ্যে আর্থিক সংকট ও সামাজিক ব্যর্থতার অনুভূতি তুলনামূলকভাবে বেশি ভূমিকা রাখছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ আত্মহত্যার ঘটনা পূর্ব সতর্ক সংকেত দেয়, কিন্তু তা উপেক্ষিত থেকে যায়। মানসিক চাপ, হতাশা, নিঃসঙ্গতা, আচরণগত পরিবর্তন বা মৃত্যুচিন্তার কথা প্রকাশ করলেও পরিবার ও সমাজ অনেক সময় বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় না। ফলে সময়মতো সহায়তা না পাওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
সুশাসনের জন্য প্রচার অভিযান (সুপ্র) এর সাধারন সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন,আত্মহত্যা রোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিবার ভিত্তিক সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা জোরদার, সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সহানুভূতির পরিবেশ তৈরি করা। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে দায়িত্বশীল প্রতিবেদন ও সচেতনতামূলক প্রচারণাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শিক্ষাবিদ ও বীট মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী মো. সাহাবুদ্দিন সৈকত বলেন, বর্তমান সময়ে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে মানসিক চাপ উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। পড়াশোনা, পরীক্ষার ফল, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং সামাজিক তুলনার চাপে অনেক শিক্ষার্থী ভেঙে পড়ছে। তিনি বলেন, আত্মহত্যা একটি প্রতিরোধযোগ্য সামাজিক সমস্যা। সময়মতো সহানুভূতিশীল মনোযোগ, মানসিক সহায়তা ও পারিবারিক বন্ধন জোরদার করা গেলে অনেক প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। বগুড়ায় ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যার প্রবণতা শুধু উদ্বেগ নয়, বরং এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিচ্ছে।



